আধুনিক নৌযুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে চালকহীন এই বিশেষ যুদ্ধযান, চলছে গোপন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নৌবাহিনী চীন এবার ব্যতিক্রমী নকশার একটি রহস্যময় সাবমেরিন নিয়ে আলোচনায় এসেছে। তিন-হাল বা ‘ট্রাইমারান’ কাঠামোর এই বিশেষ যুদ্ধযানটি প্রচলিত সাবমেরিনের চেয়ে ভিন্নভাবে নকশা করা হয়েছে। এতে ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ টিউব থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। তবে সাবমেরিনটির নাম, প্রকৃত সক্ষমতা ও অস্ত্রব্যবস্থা সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি বেইজিং।
প্রকাশিত উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য (ওসিন্ট) এবং স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যানটি চীনের নৌ-প্রযুক্তিতে নতুন একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। প্রচলিত সাবমেরিনের মতো পুরোপুরি পানির নিচ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পরিবর্তে এটি পানির নিচে গোপনে চলাচল করে প্রয়োজনের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে অস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
তিন-হাল কাঠামো ও ব্যতিক্রমী নকশা
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন এই যুদ্ধযানটির নির্মাণকাঠামোতে তিনটি হাল বা ভাসমান অংশ রয়েছে। ট্রাইমারান নকশার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠে অবস্থান, ভারসাম্য রক্ষা এবং ভারী অস্ত্রব্যবস্থা পরিচালনায় এটি বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যানটি চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংঝুতে নির্মাণের পর দালিয়ান বন্দর হয়ে উত্তরে নেওয়া হয়। বর্তমানে বোহাই সাগরের হুলুদাও নৌঘাঁটিতে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই এবং প্রকল্পটির বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র টিউব থাকার সম্ভাবনা
স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণে সাবমেরিনটির মধ্যভাগে দুটি পৃথক হ্যাঙ্গারের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রতিটি অংশে একাধিক টিউবসহ মোট ১৬টি উৎক্ষেপণ টিউব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের বর্ণনা অনুযায়ী, অস্ত্র উৎক্ষেপণের সময় যানটিকে সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে হ্যাঙ্গারের দরজা খুলতে এবং ক্ষেপণাস্ত্রের টিউবগুলোকে উল্লম্ব অবস্থানে আনতে হতে পারে। এতে জাহাজবিধ্বংসী কিংবা স্থলভাগে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
কিছু বিশ্লেষণে চীনের ওয়াইজে-২০ (YJ-20) হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র নতুন যানটিতে সংযোজন করা হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।
চালকহীন প্রযুক্তির সম্ভাবনা
জাহাজ নকশা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যানটিতে নিয়মিত নাবিকদল না-ও থাকতে পারে। অস্ত্রব্যবস্থা ও হ্যাঙ্গারগুলো বড় জায়গা দখল করায় মানুষের বসবাসের উপযোগী অভ্যন্তরীণ পরিসর সীমিত হতে পারে। এ কারণে এটিকে দূরনিয়ন্ত্রিত বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত সামুদ্রিক যান হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্রাথমিক বর্ণনায় ডিজেলচালিত ব্যবস্থা, স্নোরকেল, বৈদ্যুতিক প্রপালশন এবং পাম্পজেট প্রযুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর প্রকৃত ইঞ্জিন, চলাচলের গতি, পানির নিচে থাকার সক্ষমতা কিংবা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিগত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সোভিয়েত আমলের যুদ্ধকৌশলের আধুনিক সংস্করণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের ধারণার সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জুলিয়েট শ্রেণির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনের কিছু মিল রয়েছে। ওই শ্রেণির সাবমেরিনও সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করত।
তবে নতুন চীনা যুদ্ধযানটি সত্যিই যদি পানির নিচে গোপনে অবস্থান করে দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে, তাহলে তা সমুদ্রভিত্তিক আক্রমণকৌশলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দূরপাল্লার নজরদারি, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত সামরিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার সক্ষমতা থাকলে এটি চীনের নৌ-কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এখনো রহস্যের আড়ালে প্রকল্পটি
চীনের এই কথিত ট্রাইমারান সাবমেরিন নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে আগ্রহ বাড়লেও এর প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা, অস্ত্রের ধরন, চালকহীন পরিচালনা এবং পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যের একটি বড় অংশই বিশ্লেষণনির্ভর।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবে বর্ণিত সক্ষমতা অর্জন করে থাকলে প্রচলিত সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সারফেস জাহাজের মাঝামাঝি একটি নতুন সামরিক ধারণার সূচনা হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌ-প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় নতুন হিসাব-নিকাশ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনলাইন ডেস্ক